স্টুডেন্ট ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বর্তমানে একজন শিক্ষার্থীর শিক্ষা জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একসময় ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট খোলা মানেই ছিল বড়দের ব্যাপার, কিন্তু এখন স্কুল বা কলেজের গণ্ডি পার হওয়ার আগেই একজন শিক্ষার্থীর নিজস্ব ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থাকাটা জরুরি। বিশেষ করে সরকারি বৃত্তির টাকা উত্তোলন, উপবৃত্তি গ্রহণ কিংবা নিজের জমানো টাকা নিরাপদে রাখার জন্য এর বিকল্প নেই।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনায় এখন ১৮ বছরের কম বয়সী শিক্ষার্থীরাও খুব সহজে স্কুল ব্যাংকিং বা স্টুডেন্ট অ্যাকাউন্টের সুবিধা নিতে পারছে। সাধারণ সেভিংস অ্যাকাউন্টের চেয়ে এই অ্যাকাউন্টগুলোর নিয়মকানুন অনেক শিথিল এবং চার্জও অনেক কম। আজকের এই গাইডে আমরা জানব কীভাবে একজন শিক্ষার্থী খুব সহজে নিজের নামে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলতে পারে, কোন ব্যাংকে চার্জ সবচেয়ে কম এবং এর জন্য কী কী কাগজপত্র প্রয়োজন।
কেন খুলবেন স্টুডেন্ট অ্যাকাউন্ট?
সাধারণ সেভিংস অ্যাকাউন্ট খোলার জন্য আয়ের উৎস দেখাতে হয় এবং প্রতি বছর ৫০০ থেকে ১০০০ টাকা চার্জ দিতে হয়। কিন্তু শিক্ষার্থীদের কথা মাথায় রেখে ব্যাংকগুলো বিশেষ কিছু সুবিধা দেয়। প্রথমত, জিরো বা নামমাত্র চার্জ। বেশিরভাগ স্টুডেন্ট অ্যাকাউন্টে বাৎসরিক কোনো চার্জ নেই অথবা খুবই সামান্য। এটি শিক্ষার্থীদের জন্য বড় স্বস্তি।
দ্বিতীয়ত, বৃত্তির টাকা প্রাপ্তি। আপনি যদি এইচএসসি বা এসএসসিতে বৃত্তি পান, তবে সেই টাকা সরাসরি আপনার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে (EFT-এর মাধ্যমে) পাঠানো হয়। নিজস্ব অ্যাকাউন্ট না থাকলে এই টাকা তোলা অনেক ঝামেলার। তৃতীয়ত, ডেবিট কার্ড ও এটিএম সুবিধা। স্টুডেন্ট অ্যাকাউন্ট খুললে ব্যাংক থেকে এটিএম কার্ড দেওয়া হয়। ফলে টাকার প্রয়োজনে ব্যাংকে লাইনে দাঁড়ানোর দরকার হয় না, যেকোনো বুথ থেকে টাকা তোলা যায়।
১৮ বছরের নিচে ও ওপরে অ্যাকাউন্ট খোলার নিয়ম
বয়সভেদে অ্যাকাউন্ট খোলার নিয়মে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। যাদের বয়স ১৮ হয়নি, তারা আইনত নিজের নামে অ্যাকাউন্ট পরিচালনা করতে পারে না। তাদের ক্ষেত্রে অ্যাকাউন্টটি হবে “অভিভাবক দ্বারা পরিচালিত”। অর্থাৎ, অ্যাকাউন্টের মালিক শিক্ষার্থী হলেও, টাকা তোলা বা চেকের সই করবেন মা বা বাবা (Legal Guardian)।
অন্যদিকে, যাদের বয়স ১৮ হয়ে গেছে এবং জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) আছে, তারা স্বাধীনভাবে নিজেদের অ্যাকাউন্ট খুলতে এবং পরিচালনা করতে পারবেন। এক্ষেত্রে অভিভাবকের সাক্ষরের প্রয়োজন নেই।
প্রয়োজনীয় কাগজপত্র (Checklist)
ব্যাংকে যাওয়ার আগে কিছু কাগজপত্র গুছিয়ে নিয়ে গেলে আপনাকে আর ফিরে আসতে হবে না। শিক্ষার্থীর কাগজপত্রের মধ্যে লাগবে স্কুল বা কলেজের আইডি কার্ডের ফটোকপি অথবা সর্বশেষ বেতনের রসিদ। ১৮ বছরের নিচে হলে জন্ম নিবন্ধন সনদ এবং ১৮ বছরের বেশি হলে এনআইডি কার্ডের ফটোকপি। সাথে ২-৩ কপি পাসপোর্ট সাইজের রঙিন ছবি।
অভিভাবক বা নমিনির কাগজপত্রের ক্ষেত্রে অভিভাবকের (বাবা/মা) এনআইডি কার্ডের ফটোকপি এবং ২ কপি ছবি লাগবে। নমিনির ১ কপি ছবি এবং এনআইডি কার্ডের কপিও সাথে রাখতে হবে। এছাড়া বর্তমান ঠিকানার প্রমাণের জন্য বাসার বিদ্যুৎ, গ্যাস বা পানির বিলের ফটোকপি (গত ৩ মাসের মধ্যে) প্রয়োজন হবে।
সেরা ৫টি স্টুডেন্ট ব্যাংক অ্যাকাউন্ট (চার্জ ও সুবিধা)
বাংলাদেশে প্রায় সব ব্যাংকেই স্টুডেন্ট অ্যাকাউন্ট খোলার সুবিধা আছে। তবে সুযোগ-সুবিধা ও সহজলভ্যতার বিচারে সেরা ৫টি অপশন নিচে দেওয়া হলো:
১. ডাচ-বাংলা ব্যাংক (DBBL): শিক্ষার্থীদের কাছে এটি সবচেয়ে জনপ্রিয়। এদের এটিএম বুথ সারা দেশে ছড়িয়ে আছে। তাৎক্ষণিক ডেবিট কার্ড পাওয়া যায় এবং রকেট অ্যাপের সাথে লিঙ্ক করা যায়। বাৎসরিক চার্জ নেই বললেই চলে, তবে কার্ড ফি প্রযোজ্য হতে পারে। প্রাথমিক জমা ৫০০ টাকা।
২. সোনালী ব্যাংক: সরকারি বৃত্তির টাকা পাওয়ার জন্য এটি সেরা অপশন। সরকারি ব্যাংক হওয়ায় টাকা মার যাওয়ার ভয় নেই। যেকোনো সরকারি ফি বা চালানের জন্য এটি সুবিধাজনক। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি এবং মাত্র ১০০ টাকা জমা দিয়ে খোলা যায়।
৩. ইসলামী ব্যাংক (IBBL): যারা শরিয়াহ সম্মত ব্যাংকিং খুঁজছেন, তাদের জন্য ‘স্টুডেন্ট মুদারাবা সেভিংস অ্যাকাউন্ট’ সেরা। এটি ভালো মুনাফা বা প্রফিট দেয় এবং এর অনলাইন ব্যাংকিং অ্যাপ (CellFin) খুবই উন্নত।
৪. ব্র্যাক ব্যাংক (Agami Savers): আধুনিক ব্যাংকিং সুবিধার জন্য পরিচিত। ফ্রিল্যান্সারদের জন্য এটি ভালো। মাল্টি-কারেন্সি কার্ডের সুবিধা নেওয়া যায় (শর্তসাপেক্ষে)। চার্জ কিছুটা বেশি হতে পারে, তবে সার্ভিস প্রিমিয়াম।
৫. এবি ব্যাংক (Student Account): এদের ‘মেজর’ এবং ‘মাইনর’ দুই ধরনের অ্যাকাউন্ট আছে। কোনো হিডেন চার্জ নেই এবং চেকবই ও ডেবিট কার্ডের সুবিধা আছে।
অ্যাকাউন্ট খোলার ধাপসমূহ
প্রথমে আপনার পছন্দের ব্যাংকের নিকটস্থ শাখায় যান। ব্যাংকের ‘হেল্প ডেস্ক’ বা ‘অ্যাকাউন্ট ওপেনিং’ কাউন্টারে গিয়ে বলুন আপনি স্টুডেন্ট অ্যাকাউন্ট খুলতে চান। অফিসার আপনাকে একটি ফর্ম দেবেন। ফর্মটি সতর্কতার সাথে পূরণ করুন। নামের বানান যেন আপনার এনআইডি বা জন্ম নিবন্ধনের সাথে হুবহু মিলে।
ফর্মের নির্দিষ্ট জায়গায় আপনার এবং অভিভাবকের ছবি আঠা দিয়ে লাগান। ছবির ওপর এবং ফর্মের নির্দিষ্ট স্থানে সাক্ষর করুন। ১৮ বছরের নিচে হলে অভিভাবককেও সাক্ষর করতে হবে। ফর্ম জমা দেওয়ার সময় প্রাথমিক জমার টাকা (১০০ থেকে ৫০০ টাকা) কাউন্টারে জমা দিন। অফিসার আপনাকে একটি জমার রসিদ বা ‘ডিপোজিট স্লিপ’ দেবেন। এটি যত্ন করে রাখুন। সাধারণত ৩ থেকে ৭ কর্মদিবসের মধ্যে আপনার অ্যাকাউন্ট চালু হয়ে যাবে এবং মোবাইলে এসএমএস আসবে।
সতর্কতা ও পরামর্শ
অ্যাকাউন্ট খোলার সময় নমিনি (Nominee) হিসেবে যাকে দিচ্ছেন, তার নাম ও তথ্য সঠিকভাবে দিন। সাধারণত বাবা বা মাকে নমিনি করা ভালো। চেকবই বা এটিএম কার্ডের পিন নাম্বার গোপন রাখুন। ব্যাংকের কোনো কর্মকর্তা কখনোই ফোনে আপনার পিন বা ওটিপি (OTP) চাইবেন না।
বৃত্তির টাকার জন্য অ্যাকাউন্ট খুললে অবশ্যই সেই অ্যাকাউন্টের চেক বই বা চেকের পাতা সংগ্রহে রাখবেন না (যদি না প্রয়োজন হয়), কারণ এতে চার্জ কাটতে পারে। শুধু ডেবিট কার্ড নেওয়াই শিক্ষার্থীদের জন্য সাশ্রয়ী।
Best Student Bank Account Opening Rules in Bangladesh
স্টুডেন্ট ব্যাংক অ্যাকাউন্ট একজন শিক্ষার্থীর জীবনে আর্থিক শৃঙ্খলার প্রথম ধাপ। এটি শুধু টাকা জমানোর জায়গা নয়, বরং ব্যাংকিং কার্যক্রম সম্পর্কে বাস্তব জ্ঞান অর্জনের একটি মাধ্যম। আপনার যদি এখনো কোনো অ্যাকাউন্ট না থাকে, তবে আজই প্রয়োজনীয় কাগজপত্র গুছিয়ে নিকটস্থ ব্যাংকে চলে যান। নিজের জমানো টাকা এবং বৃত্তির টাকা নিরাপদে রাখার জন্য এটিই সেরা সিদ্ধান্ত।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
১. অ্যাকাউন্ট খুলতে কত টাকা লাগে? বেশিরভাগ সরকারি ব্যাংকে ১০০ টাকা এবং বেসরকারি ব্যাংকে ৫০০ টাকা প্রাথমিক জমা দিয়ে অ্যাকাউন্ট খোলা যায়। এই টাকাটা আপনার অ্যাকাউন্টেই থাকে, ব্যাংক কেটে নেয় না।
২. স্টুডেন্ট অ্যাকাউন্টের কি কোনো মেয়াদ আছে? না। তবে আপনার ছাত্রজীবন শেষ হয়ে গেলে বা বয়স ১৮ পার হলে ব্যাংককে জানিয়ে এটিকে সাধারণ সেভিংস অ্যাকাউন্টে রূপান্তর করে নিতে হয়।
৩. বৃত্তির টাকা কি সব ব্যাংকে আসে? হ্যাঁ, অনলাইন বা কোর ব্যাংকিং সুবিধা আছে এমন যেকোনো ব্যাংকে বৃত্তির টাকা আসে। তবে সোনালী, অগ্রণী বা ডাচ-বাংলা ব্যাংকে প্রসেসিং কিছুটা দ্রুত হয়।
৪. আমি কি চেক বই পাব? হ্যাঁ, চাইলে ব্যাংক আপনাকে চেক বই দেবে। তবে ১৮ বছরের নিচের শিক্ষার্থীদের অ্যাকাউন্টের চেক শুধুমাত্র অভিভাবক সাক্ষর করে টাকা তুলতে পারবেন।
৫. এটিএম কার্ড দিয়ে কি অনলাইনে কেনাকাটা করা যাবে? বেশিরভাগ ব্যাংকের স্টুডেন্ট কার্ড দিয়ে অনলাইনে (যেমন: দারাজ, রকমারি) কেনাকাটা করা যায়। তবে এর জন্য ব্যাংকে বলে ই-কমার্স ট্রানজেকশন অন করে নিতে হতে পারে।



1 thought on “স্টুডেন্ট ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার নিয়ম: সেরা ব্যাংক ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র”