প্রাথমিক উপবৃত্তি: দেশের প্রাথমিক শিক্ষার মান উন্নয়ন এবং ঝরে পড়া রোধে সরকারের অন্যতম সফল উদ্যোগ হলো উপবৃত্তি প্রদান। তবে দীর্ঘদিন ধরে এই উপবৃত্তির টাকা পাওয়া নিয়ে অভিভাবকদের ভোগান্তির শেষ ছিল না। বিশেষ করে একটি নির্দিষ্ট মোবাইল ব্যাংকিং সেবার ওপর নির্ভরশীলতা এবং সার্ভার জটিলতা ছিল নিত্যদিনের সঙ্গী।
প্রাথমিক উপবৃত্তি: টাকা চেক করার কোড ও নতুন নিয়ম
অবশেষে সেই ভোগান্তির অবসান হতে যাচ্ছে। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর (DPE) ঘোষণা করেছে যে, প্রাথমিক উপবৃত্তি ২০২৫-এর অর্থ এখন থেকে অভিভাবকদের পছন্দের যেকোনো মোবাইল ব্যাংকিং হিসাবে পাঠানো হবে। অর্থাৎ, আর শুধু নগদ (Nagad) নয়; বিকাশ (bKash), রকেট (Rocket), উপায় (Upay) কিংবা এমক্যাশ (mCash)-এর মাধ্যমেও টাকা পাওয়া যাবে।
আগামী স্কিল-এর শিক্ষা ডেস্ক থেকে আজকের এই মেগা গাইডে আমরা উপবৃত্তির এই বিশাল পরিবর্তন, টাকা চেক করার নিয়ম (USSD Code), টাকা না আসার কারণ এবং হাই স্কুলের উপবৃত্তি সংক্রান্ত আপডেট নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
উপবৃত্তি বিতরণে বড় পরিবর্তন: নগদের একক আধিপত্য শেষ
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর তাদের সাম্প্রতিক নির্দেশনায় জানিয়েছে, আগের একক চুক্তিটি বাতিল করা হয়েছে। ২৯ সেপ্টেম্বর জারি করা এক চিঠিতে বলা হয়, ডাক বিভাগের ডিজিটাল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস ‘নগদ লিমিটেড’-এর সঙ্গে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের সম্পাদিত ত্রিপক্ষীয় চুক্তিটি বাতিল করা হয়েছে।
কেন এই পরিবর্তন? বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনে উঠে এসেছে যে, বিগত সরকারের সময়ে নগদের মাধ্যমে বৃত্তি প্রদানে বড় ধরনের অনিয়ম হয়েছে। এছাড়া অর্থ বিভাগের নির্দেশনার সঙ্গে সামঞ্জস্য না থাকা এবং চুক্তিপত্রের শর্ত পালন করতে না পারার কারণে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
নতুন নিয়ম: এখন থেকে দেশের সব মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (MFS) প্রতিষ্ঠানের সবার সমান সুযোগ নিশ্চিত করা হয়েছে। ২৬ অক্টোবর থেকে কার্যকর হওয়া নির্দেশনায় বলা হয়েছে, অভিভাবকরা তাদের সুবিধামতো যেকোনো অপারেটর বেছে নিতে পারবেন।
উপবৃত্তির টাকা চেক করবেন যেভাবে (Check Balance)
অভিভাবকদের সবচেয়ে সাধারণ প্রশ্ন হলো—“উপবৃত্তির টাকা কিভাবে চেক করব?” বা “উপবৃত্তির টাকা দেখার কোড” কোনটি? যেহেতু এখন বিভিন্ন অপারেটরে টাকা আসবে, তাই একেকটির চেক করার নিয়ম একেক রকম।
নিচে জনপ্রিয় মোবাইল ব্যাংকিংগুলোর ব্যালেন্স চেক করার ইউএসএসডি কোড দেওয়া হলো:
| মোবাইল ব্যাংকিং | ইউএসএসডি কোড (Dial Code) | চেক করার পদ্ধতি |
| বিকাশ (bKash) | *247# | Dial > Option 9 (My bKash) > Check Balance |
| নগদ (Nagad) | *167# | Dial > Option 7 (My Nagad) > Check Balance |
| রকেট (Rocket) | *322# | Dial > Option 5 (My Account) > Check Balance |
| উপায় (Upay) | *268# | Dial > Option (Check Balance) |
| এমক্যাশ (mCash) | *259# | Dial > Check Balance |
স্মার্ট টিপস: স্মার্টফোন ব্যবহারকারীরা সংশ্লিষ্ট অ্যাপ (App) ব্যবহার করে আরও সহজে ব্যালেন্স চেক করতে পারেন এবং স্টেটমেন্ট দেখতে পারেন।
উপবৃত্তির টাকা না আসার কারণ ও সমাধান
অনেক অভিভাবক অভিযোগ করেন যে তাদের অ্যাকাউন্টে টাকা আসেনি। উপবৃত্তির টাকা না আসার কারণ গুলো মূলত প্রযুক্তিগত এবং তথ্যগত ভুলের কারণে হয়ে থাকে।
প্রধান কারণসমূহ: ১. এনআইডি (NID) সমস্যা: অভিভাবকের মোবাইল সিমটি যদি তাদের নিজস্ব জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) দিয়ে নিবন্ধিত না থাকে, তবে টাকা আসবে না। নতুন নির্দেশনায় এনআইডি দিয়ে সিম ও এমএফএস হিসাব নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ২. অ্যাকাউন্ট স্ট্যাটাস: মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্টটি যদি ‘Active’ না থাকে বা কেওয়াইসি (KYC) ফর্ম পূরণ না থাকে। ৩. তথ্য ভুল: স্কুলে দেওয়া মোবাইল নম্বরের সাথে আপনার বর্তমান সচল নম্বরের মিল না থাকা। ৪. লিমিট সমস্যা: অ্যাকাউন্টের লেনদেন সীমা অতিক্রান্ত হওয়া (যদিও উপবৃত্তির ক্ষেত্রে এটি কম ঘটে)।
সমাধান: যদি টাকা না আসে, তবে দ্রুত আপনার সন্তানের স্কুলের প্রধান শিক্ষকের সাথে যোগাযোগ করুন এবং পেমেন্ট স্ট্যাটাস চেক করতে বলুন। প্রয়োজনে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের পোর্টালে তথ্য আপডেট করতে হবে।
প্রাথমিক ও হাই স্কুলের উপবৃত্তির টাকা কবে দিবে?
টাকা পাওয়ার সময়সূচি নিয়ে অভিভাবকদের আগ্রহের শেষ নেই। সরকার সাধারণত বছরে ৪টি কিস্তিতে বা ৬ মাস পর পর টাকা ছাড় করে।
প্রাথমিক বিদ্যালয়: নতুন নিয়মে এমএফএস নির্বাচন প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পরপরই বকেয়া এবং চলতি কিস্তির টাকা পাঠানো শুরু হবে। ২০২৫ সালের প্রথম কিস্তি (জানুয়ারি-মার্চ) সাধারণত মে-জুন মাসের দিকে ছাড় করা হতে পারে।
হাই স্কুলের উপবৃত্তির টাকা কবে দিবে ২০২৫? মাধ্যমিক বা হাই স্কুলের উপবৃত্তি সাধারণত ‘সমন্বিত উপবৃত্তি কর্মসূচি’-এর আওতায় দেওয়া হয়। ২০২৫ সালের সেশনের টাকা বিতরণের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। সাধারণত ঈদের আগে বা শিক্ষাবর্ষের মাঝমাঝি সময়ে এই টাকা অ্যাকাউন্টে জমা হয়। এ সংক্রান্ত নোটিশ বা DPE stipend notice প্রকাশিত হওয়া মাত্রই আমরা আপডেট দেব।
অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের করণীয়
নতুন এই সুযোগটি কাজে লাগাতে অভিভাবকদের কিছু দায়িত্ব পালন করতে হবে: ১. সঠিক নম্বর প্রদান: স্কুলে আপনার পছন্দের মোবাইল ব্যাংকিং নম্বরটি (বিকাশ/রকেট/নগদ) লিখিতভাবে জমা দিন। ২. সিম নিবন্ধন: নিশ্চিত করুন যে সিমটি আপনার নিজের এনআইডি দিয়ে কেনা। ৩. অ্যাকাউন্ট সচল রাখা: যে নম্বরে টাকা আসবে, সেটি সবসময় চালু রাখুন এবং পিন কোড (PIN) কারো সাথে শেয়ার করবেন না।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
প্রশ্ন ১: আমি কি নগদের পরিবর্তে বিকাশ নম্বর দিতে পারব? উত্তর: হ্যাঁ, নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী আপনি বিকাশ, রকেট, উপায় বা এমক্যাশ—যেকোনো নম্বর দিতে পারবেন।
প্রশ্ন ২: উপবৃত্তির জন্য আলাদা কোনো লগইন বা ওয়েবসাইট আছে? উত্তর: অভিভাবকদের জন্য সরাসরি উপবৃত্তি লগইন করার কোনো সুযোগ নেই। এটি শুধুমাত্র স্কুল কর্তৃপক্ষ বা শিক্ষকদের জন্য সংরক্ষিত (PEMIS Software)। আপনি তথ্য আপডেটের জন্য শিক্ষকদের সহায়তা নেবেন।
প্রশ্ন ৩: একাউন্টে টাকা আসলে বুঝব কীভাবে? উত্তর: টাকা জমা হওয়ার সাথে সাথে আপনার মোবাইলে একটি এসএমএস (SMS) আসবে। এছাড়া উপরে দেওয়া কোড ডায়াল করে ব্যালেন্স চেক করতে পারেন।
প্রাথমিক উপবৃত্তি-এর এই নতুন পদ্ধতি স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করবে বলে আশা করা যাচ্ছে। পছন্দের অপারেটরে টাকা পাওয়ার সুযোগ অভিভাবকদের ভোগান্তি কমাবে। তবে এর সুফল পেতে সঠিক তথ্য দিয়ে সহায়তা করা আমাদের নাগরিক দায়িত্ব।
আরও পড়ুন: এইচএসসি বৃত্তি ২০২৫: মেধা ও সাধারণ বৃত্তির বোর্ডভিত্তিক তালিকা প্রকাশ, পাচ্ছেন ১০,৫০০ শিক্ষার্থী


